একজন নকীরের গল্প

রাত দুইটা বেজে আটত্রিশ মিনিট।
বারোজন কিম্ভূতকিমাকার সরকারী  বাহিনীর লোক নকীরের ঘরের দরজা ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করলো
ভাবলেশহীন নকীর তখন ঘরের এককোনায় জানলার পাশে বসে চাঁদের  আলো গোগ্রাসে গিলছিলো
সরকারী বাহিনীর একজন হুট করে প্রচন্ড জোরে লাথি মেরে নকীরকে চেয়ার থেকে ফেলে দিলো
আরেকজন তড়িঘড়ি করে নকীরকে পিছমোড়া করে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে দিলো
টেনে হিঁচড়ে নকীরকে সরকারী বাহিনীর গাড়িতে তোলা হল
অতঃপর গাড়িটি নকীরকে নিয়ে অজানা উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

 

পরেরদিন ।
সকাল এগারটা বেজে  পঁয়তাল্লিশ মিনিট।
নকীর দাঁড়িয়ে আছে মঞ্ছে উপবিষ্ট  মহামান্য বিচারপতির সামনে !
তার সামনে পুরো জায়গা জুড়ে অসংখ্য কালো পোশাকধারী মহামান্য বিচারপতির সামনে হাত-মাথা নেড়ে কথা বলছে
নকীর  আধো আধো ঘুম চোখে শুধু  দেখতেই পাচ্ছে , কিন্তু তাদের কোনো কথাই তার কানে প্রবেশ করছেনা
এইভাবেই কেটে গেলো  আটচল্লিশ মিনিট
হঠাৎ নকীর প্রচন্ড চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো “আমি এখানে কেনো? আমার কি অপরাধ? হে মহামান্য বিচারপতি”
উপস্থিত মঞ্ছে উপবিষ্ট মহামান্য বিচারপতি সহ সকলে ভূত দেখার মত করে চমকে উঠলো !
হাতে প্রচন্ড জোরে ধাক্কা দিয়ে এক চাপরাশি নকীর কে বললো,”চুপ করে হে ! এটা বিচারালায়, তোমার ড্রয়িং রুম নয়”
নকীর একপ্রকার ঘাবড়ে গেলো
 এক কালো পোশাকধারী নকীরের পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়ায় দয়াপরবশ হয়ে মহামান্য বিচারপতি তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করল।

 

রিমান্ডের প্রথম দিন।
সন্ধ্যা সাতটা ।
নকীর নিজেকে আবিস্কার করল অনেক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ এক বিশাল রুমে
কয়েকজন সাদা পোশাকধারী এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে,
কি যেন এক  ভুতুড়ে ব্যস্ততা তাদের সকলের মাঝে
নকীর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেই শুধু , কিন্তু সাদা পোশাকধারীরা কি বলছে কিংবা কেনইবা তাদের এত ব্যস্ততা তার কিছুই নকীর বুঝতে পারছেনা।

 

রিমান্ডের প্রথম দিন।
রাত দশটা বেজে চুয়ান্ন মিনিট।
নকীরের চারদিকে অসংখ্য মেশিন ধীরে ধীরে ধেয়ে আসছে , সাথে অসংখ্য সাদা পোশাকধারী
নকীরের কাছাকাছি মেশিন গুলো চলে আসতেই নকীর ভয়ার্ত এক  আর্তনাদ করে উঠল
নকীরের মনে হলো তার আর্তনাদের উচ্চশব্দে তার নিজেরই শব্দনালী ফেটে যাবে
কিন্তু কেউ তার আর্তনাদ যেন শুনতেই পেলোনা এমন একটা ভাব সকলের
একের পর এক সকল মেশিন এসে তার মাথাটা গ্রাস করে নিচ্ছে, সাদা পোশাকধারীরা প্রচন্ড ক্ষিপ্রতায় নকীরের হাত-পা চেপে রেখেছে
নকীরের মনে হচ্ছে কেউ তার ব্রেইনে একের পর এক বিশাল আকারের সুঁই ফুটিয়ে চলছে
প্রচন্ড যন্ত্রনায় নকীরের বছরখানেক আগের  বিদ্যুস্পটতার ঘটনা বার বার মনে হতে লাগল
এ যন্ত্রনা তার চেয়েও ভয়ংকর।

 

রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন।
সকাল আটটা বেজে একত্রিশ মিনিট।
নকীর সেন্সলেস হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে , প্রচন্ড যন্ত্রনায় নকীরের চোখের পাতা খোলা
নকীর সেন্সলেস কিন্তু সে দেখছে সকল সাদা পোশাকধারীরা একের পর এক নতুন মেশিন নাড়াছাড়া করছে
মেশিন গুলো দেখতে গতকালের চেয়েও বেধড়ক ভয়ংকর
নকীর সেন্সলেস কিন্তু সে ঠিক ভাবতে পারছে !
তার ভাবনা জুড়ে ঘুরছে এক প্লেট সাদা ভাত, একটু ডাল আর একটু ভর্তা
প্লেটের ভাত গুলো তার ব্রেইন ভেদ করে ছুটাছুটি করছে তার সমস্ত স্কাল  জুড়ে।

 

রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন ।
রাত দশটা বেজে চুয়ান্ন মিনিট।
একপ্লেট ভাতের কথা ভাবতে থাকা নকীরের স্কাল কাটা হচ্ছে সুনিপণ ভাবে
নকীর এখনও ঠিক ভাবতে পারছে , দেখতে পাচ্ছে তার স্কাল কাটার দৃশ্য
নকীরের স্কালের উপরিভাগ এখন একজন সাদা পোশাকধারীর হাতে
সাদা পোশাকধারী বিভিন্ন ভাবে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে নকীরের স্কালের উপরিভাগ পর্যবেক্ষণ করেছেন
হুট করে একজন সাদা পোশাকধারী এসে নকীরের স্কালের ব্রেইন হতে পিনিয়াল গ্ল্যান্ডটা এক প্রকার ছিঁড়েই  নিয়ে গেল
সকল সাদা পোশাকধারী এলিয়েন দেখার মত করে নকীরের পিনিয়াল গ্ল্যান্ড পর্যবেক্ষণ করছেন
নকীরের পিনিয়াল গ্ল্যান্ড তখনো স্পন্দিত হচ্ছে দেখে একজন সাদা পোশাকধারী চেতনানাশক ইঞ্জেকশন পুশ করে দিলো নকীরের পিনিয়াল গ্ল্যান্ডে
কিন্তু নকীর এখনো ঠিক ভাবতে পারছে, স্বাভাবিক মানুষের মত দেখতে পারছে।

 

রিমান্ডের তৃতীয় দিন ।
সকাল দশটা বেজে চুয়ান্ন মিনিট।
পিনিয়াল গ্ল্যান্ডহীন ব্রেইন নিয়ে নকীর শুয়ে আছে মেঝেতে
তার ভাবনা জুড়ে ঘুরছে এক গ্লাস পানি, এক প্লেট সাদা ভাত, একটু ডাল আর একটু ভর্তা
পাশে একজন সাদা পোশাকধারী কচকচ করে নকীরের পিনিয়াল গ্ল্যান্ডকে কাঁচি দিয়ে খুঁচিয়েই চলছে
নকীরের কাছে পুরো বিষয়টা এখন খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে
বরঞ্চ এক গ্লাস পানি, এক প্লেট সাদা ভাত, একটু ডাল আর একটু ভর্তার বিষয়টাই এখন খুব অদ্ভুত মনে হচ্ছে।

 

রিমান্ডের তৃতীয় দিন ।
রাত দশটা বেজে দশ মিনিট।
একজন সাদা পোশাকধারী এসে নকীরের স্কাল হতে পুরো ব্রেইনটা বের করে নিয়ে গেলো
নকীরের স্কাল এখন শুন্য, ব্রেইনলেস
কিন্তু নকীর এখনো ঠিক ভাবতে পারছে, স্বাভাবিক মানুষের মত দেখতে পারছে
নকীর দেখছে তার ব্রেইনকে সামনে রেখে  সাদা পোশাকধারী এক বুড়ো হাসছে  আর  কাগজে কি যেন লিখেই চলছে।

 

পরেরদিন।
সকাল দশটা।
তিনজন সরকারী বাহিনীর লোক এসে নকীরকে তুলে নিয়ে গেল
সকাল এগারটা।
নকীর দাঁড়িয়ে আছে মঞ্ছে উপবিষ্ট  মহামান্য বিচারপতির সামনে !
নকীর এখন জানে  এখানে কি করতে হবে তাকে
তাই নকীর চুপ করে দেখেই যাচ্ছে যেনো পুরো বিষয়টা খুবই স্বাভাবিক
কালো পোশাকধারী একজন মহামান্য বিচারপতির সামনে কিছু রিপোর্ট রেখে বলতে শুরু করল
মহামান্য বিচারপতি, আসামীর সমস্ত রিপোর্ট এটাই প্রমান করে যে
আসামী জেনেবুঝে সাতশ আটানব্বইটি স্বপ্নকে হত্যা করেছে !
মহামান্য বিচারপতি ! সাতশ আটানব্বইটি স্বপ্ন !
নকীর কালো পোশাকধারীর কথা শুনে এই প্রথম জানতে পারলো তার অপরাধ
কিন্তু এমন অভিযোগ শুনেও নিশ্চুপ নকীর
কারন এর আগেরবার চাপরাশি তাকে শিখিয়েছে এখানে কি করতে হবে
মহামান্য বিচারপতি সমস্ত রিপোর্ট পর্যবেক্ষণের পর বলতে শুরু করল
সমস্ত তথ্যপ্রমানাদি প্রমান করে যে আসামী সাতশ আটানব্বইটি স্বপ্নকে হত্যা করেছে !
অতএব মহামান্য আদালত তাকে স্বপ্ন হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে আসামীকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকরের নির্দেশ দিচ্ছে।
নকীরের কি করা উচিত তা বুঝে উঠার আগেই একদল সরকারী বাহিনীর লোক এসে নকীরকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে মহামান্য বিচারপতির সামনে  থেকে
নকীর এখন আর ঠিক ভাবতে পারছেনা তার সাথে আসলে কি হচ্ছে, তারইবা কি করা উচিত
নকীরের ভাবনায় ভেসে আসছে তার কিছু প্রিয়মানুষের মুখ
কিন্তু কেন? কেন? নকীর ঠিক মিলাতে পারছেনা
এই ঘটনার সাথে তার প্রিয় মানুষ গুলোর সম্পর্ক কি? নকীর ভাবছে আর ভাবছে
কিন্তু নকীর ঠিক যোগসূত্র মিলাতে পারছেনা
এরই মধ্যে নকীরকে সরকারী বাহিনী বিশাল এক দালানের ছোট্ট একটা রুমে ফেলে বাইরে থেকে আটকে দিলো।

 

একমাস পর।
ভোর বেলা।
নকীরের বদ্ধ রুমে সূর্যের আলো উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে
নকীরের আজ খুব ইচ্ছে করছে সকালের সূর্য দেখার
নকীর প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালো
নকীর তার রুমের লোহার গ্রিলে প্রচন্ড ঝাঁকি দিয়ে চিৎকার দিচ্ছে
আমাকে একটা বার সকালের সূর্য দেখতে দাও
আমি শেষবারের মতো সূর্যটাকে আরেকবার দেখতে চাই
নকীরের চিৎকার বিশাল দালানের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে তারই কানে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে
নকীরের মনে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ চিৎকার ভেসে আসছে চারপাশ হতে
লক্ষ লক্ষ নারী পুরুষ  শিশুর  চিৎকার, আকুতি
নকীর বুঝতে পারলো এই বিশাল দালানে শুধুমাত্র একজন নকীর নয় , এই বিশাল দালানে লক্ষ লক্ষ নকীরের বসবাস
এসব নকীররা কেউ কাউকে দেখছে না কিন্তু প্রত্যেকে প্রত্যেকের চিৎকার শুনছে।

 

দুইমাস পর।
বিকাল বেলা।
নকীরের শরীরের শেষ ফোঁটা রক্ত এখন নকীরের হাতের ডগায়
যত্ন সহকারে সে বদ্ধ রুমের দেয়ালে লিখেই চলছে তার এই পরিণতির সাথে তার প্রিয় মানুষ গুলোর চেহারা ভেসে উঠার যোগসূত্র
নকীরের আরো কিছু লেখার বাকি আছে, কিন্তু নকীরের শরীরে আর একফোঁটাও রক্ত অবশিষ্ট নেই
কিন্তু নকীর ভাবছে যা সে লিখতে পেরেছে তা পড়লেই   মহামান্য বিচারপতি নকীরকে বেখসুর খালাস দিবেন
ভাবতে ভাবতে নকীর মনটা হাল্কা হয়ে যাচ্ছে , নকীর শরীরে জোর ফিরে পাচ্ছে
নকীরের পিনিয়াল গ্ল্যান্ড কাজ করতে শুরু করেছে পুরোদমে
এখন শুধু মহামান্য বিচারপতির সামনে দাঁড়ানোর পালা
নিজে মুক্ত হয়ে একে একে মুক্ত করে আনবেন তারই মত হাজার হাজার নকীরকে
যারা কিনা তাদের এই পরিণতির সাথে তাদের প্রিয়জনের মুখ ভেসে উঠার কারন এখনো ঠিক মিলাতে  পারেননি
নকীরের ব্রেইনজুড়ে এখন রাজ্যর স্বপ্ন ,একটি বিপ্লবের স্বপ্ন
এইসব ভাবতে ভাবতে টানা আড়াই মাস পর নকীরের চোখের পাতা বুঝে এলো
নকীর ঘুমাচ্ছে।

 

সন্ধ্যা সাতটা।
ঘুম ভাঙ্গার পর নকীর দেখতে পেলো দুইজন সরকারী বাহিনীর লোক তাকে টেনে তুলছে
নকীর ভাবছে হয়তো আজ তাকে মহামান্য বিচারপতির সামনে উপস্থিত করানো হবে
নকীর এবার নিজ দায়িত্বে উঠে দাঁড়ালো, নকীরের চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক
আজ তার মুক্তির দিন, শুধু মহামান্য বিচারপতির তার রক্তেলেখা কবিতা পড়ার বাকি
নকীর স্বাভাবিক ভাবে সম্মুখপানে এগিয়ে চলছে, নকীর হাসছে, স্মিত সে হাসি
এ হাসিতেই স্বাধীনতা , এ হাসিতেই মুক্ত বিহঙ্গ
মোনালিসার পর কারো হাসির দিকে এইভাবে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা যায়
নকীর সম্মুখপানে যতই এগিয়ে চলছে ততই তার মুখায়ব জুড়ে স্বাধীনতার প্রতীক ভেসে উঠছে
আশেপাশের সকল সরকারী বাহিনী হা করে তাকিয়ে আছে নকীরের মুখের দিকে
হঠাৎ নকীরকে থামতে বলা হলো একটা মঞ্ছের সামনে
এমন অদ্ভুত মঞ্ছ নকীর দেখেনি আগে
মঞ্ছের মাঝে একটা সাদা মোটা রশি ঝুলছে
নকীরকে এগিয়ে যেতে বলা হচ্ছে রশি বরাবর সামনে
নকীর এগিয়ে চলছে সম্মুখপানে,  ঠিক সাদা রশি বরাবর নিচে
নকীরের চোখেমুখে স্মিথ  হাসি
এই বুঝি মহামান্য বিচারপতি উপস্থিত হবেন
উপস্থিত হবেন কালো পোশাকধারীরাও
তাকে ধমক দেওয়া সেদিনের সেই চাপরাশিটাও
নকীর আজ সবাইকে জানিয়ে দিবে সে কোনো  অপরাধ করেনি
সে জানিয়ে দিবে বিচারিক পদ্ধততির অসারতা
সে জানিয়ে দিবে মহামান্য বিচারপতির ব্যর্থতার গল্প
একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা স্যুট-টাই পরা এক ব্যক্তি নিজের হাতের ঘড়ির দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছেন
কিছুক্ষন পর হঠাৎ করে স্যুট-টাই পরা  ব্যক্তিটি তার হাতের রুমাল মাঠিতে ফেলে দিলেন
নকীরের চোখেমুখে এখনো স্মিথ সে হাসি লেগেই আছে
এই বুঝি মহামান্য বিচারপতি উপস্থিত হবেন।

 

আটমাস পর।
বদ্ধ রুমের দেয়ালে  নকীরের রক্তেলেখা কবিতাটি কাগজে লিখে দিয়ে আসা হলো তার বাবা , মা , শিক্ষকসহ সকল প্রিয়জনকে।
নকীরের  কবিতা পাঠ করছেন  তার বাবা
নকীরের বাবা কবিতা পাঠ করছেন আর তার  চোখে জলের পরিমান বাড়ছে ধীরে ধীরে
হঠাৎ নকীরের বাবার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো
প্রচন্ড আক্রোশ নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে নকীরের বাবা কবিতার কাগজটি ছুঁড়ে মারলেন মেঝেতে
কি এমন পড়ে তিনি এতোটা উন্মত্ত হয়ে উঠলেন ঠিক বোঝা গেলোনা।
নকীরের  কবিতা পাঠ করছেন তার মা
সকাল থেকে এই নিয়ে বাইশ বারের উপর তিনি কবিতাটি পড়েছেন
নকীরকে তিনি পেটে ধরেছিলেন, কিন্তু কি অদ্ভুত ! নকীরের লেখা কবিতার  একটা শব্দও তিনি ঠিক বুঝতে পারছেননা
সাতানব্বইতম পাঠ চলছে, তিনি আর নিতে পারছেন না নকীরের কবিতার শব্দগুলোকে
উনার এখন বমি বমি ভাব হচ্ছে, উনার মুখ ভরে বমি আসছে
অসতর্কতাবশত উনার বমির চোট গিয়ে লাগলো নকীরের কবিতা লেখা কাগজে
উনি এক প্রকার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
নকীরের  কবিতা পাঠ করছেন তার ইউনিভার্সিটির প্রিয় শিক্ষক
কবিতা পাঠ শেষে তিনি বিদ্রুপের সুরে বললেন, “এইট্যা কোনো কবিতা হলো?”
শুধু শুধু সময় নষ্ট !
এইভাবেই নকীরের কবিতা পাঠ করেই চলছে তার প্রিয় মানুষগুলো
কিন্তু নকীরের ভালোবাসার মানুষগুলোর কেউই শান্ত ভাবে একাগ্র চিত্তে পুরো কবিতা পাঠ শেষ করতে পারেননি
অদ্ভুতভাবে সকলেই কবিতার কোনো না কোনো বাক্যে এসে উন্মত্ততায় ফেটে পড়েছেন
কিন্তু কেন? এমন কিইবা লেখা আছে নকীরের কবিতায়? আর থাকলেও কেনইবা আছে?
পুরো বিষয়টা নিয়ে আজ আট বৎসর ভেবেই চলছেন তরুন কবি সিদ্দিকুন
কিছুদিন আগে কিছু টাকার বিনিময়ে নকীরের এক প্রিয়জনের কাছ থেকে নকীরের লেখা কবিতাটা হাতিয়ে নিলেন কবি সিদ্দিকুন
কবি সিদ্দিকুনের আট বৎসরের প্রচেষ্টা সফল হতে চলছে
সিদ্দিকুন জনসমক্ষে প্রবেশ করবেন নকীরের রক্তেলেখা কবিতাটা সেইসাথে নকীরের কবিতার সকল ব্যাখ্যা বিশ্লেষন।

 

রাত দুইটা বেজে আটত্রিশ মিনিট
বারোজন কিম্ভূতকিমাকার সরকারী  বাহিনীর লোক কবি সিদ্দিকুনের ঘরের দরজা ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করলো
ভাবলেশহীন কবি সিদ্দিকুন তখন ঘরের এককোনায় জানলার পাশে বসে চাঁদের  আলো গোগ্রাসে গিলতে গিলতে ভাবছিলো
নকীরের কবিতাটা জনসমক্ষে যেহেতু এখনো আসেনি সেহেতু নকীরের লেখা কবিতাটা তার নিজের নামে চালিয়ে দিবে কিনা !
এমন একটা মৌলিক কবিতা লিখতে পারলেই যে কোনো কবির কবিজীবন সার্থক
সিদ্দিকুন দেখতে পাচ্ছে তার সামনে হাজার হাজার মানুষ তাকে করতালি দিয়ে অভিবাদন জানাচ্ছে
সিদ্দিকুন হাসতে হাসতে মঞ্ছের দিকে এগিয়ে চলছে
মঞ্চে তার জন্য পুরুস্কার হাতে অপেক্ষা করছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী !
কবি  সিদ্দিকুন  প্রায় মঞ্ছের কাছাকাছি চলে এসেছেন ,আর পাঁচ সেকেন্ড পরেই তিনি শ্রেষ্ট কবির পুরস্কার নিবেন
হঠাৎ সরকারী বাহিনীর একজন  প্রচন্ড জোরে লাথি মেরে কবি সিদ্দিকুনকে চেয়ার থেকে ফেলে দিলো
আরেকজন তড়িঘড়ি করে কবি সিদ্দিকুনকে পিছমোড়া করে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে দিলো
টেনে হিঁচড়ে কবি সিদ্দিকুনকে সরকারী বাহিনীর গাড়িতে তোলা হল
অতঃপর গাড়িটি কবি সিদ্দিকুনকে নিয়ে অজানা উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

 

একবছর পর।
কিছুদিন আগে কিছু টাকার বিনিময়ে কবি সিদ্দিকুনের এক প্রিয়জনের কাছ থেকে কবি সিদ্দিকুনের লেখা কবিতাটা হাতিয়ে নিলাম।
রাত দুইটা বেজে আটত্রিশ মিনিট
ঘরের এককোনায় জানলার পাশে বসে চাঁদের  আলো গোগ্রাসে গিলতে গিলতে  দরজা ভাঙ্গার শব্দের জন্য অপেক্ষা করছি।
M M Shahria

Director/Scriptwriter

Related Post

Leave A Comment